বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘স্বৈরাচারের মতোই বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল যাদের জনগণ গুপ্ত পরিচয়ে চেনে, তারা এখন নতুন জালেমরূপে আবির্ভূত হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘স্বৈরাচারের মতোই বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল যাদের জনগণ গুপ্ত পরিচয়ে চেনে, তারা এখন নতুন জালেমরূপে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের কাছে দেশের মা-বোনরা নিরাপদ নয়। কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখতে পাচ্ছি, কীভাবে তাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া সিল তৈরি করছে। শুনতে পাচ্ছি যে তাদের পরিচিত প্রেসে তারা ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে।’ গতকাল নগরের বান্দ রোডের বেলস পার্কে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। দুপুর ১২টার দিকে তারেক রহমান হেলিকপ্টারে চড়ে বরিশাল স্টেডিয়ামে পৌঁছান। সেখান থেকে গাড়িতে তিনি জনসভাস্থলে যান। এ সময় সড়কের দুই পাশে বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানান। দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে তারেক রহমান জনসভার মঞ্চে পৌঁছান। তিনি প্রায় ৩০ মিনিট বক্তব্য দেন।
তারেক রহমান জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, বিশেষ করে নিরীহ মা-বোন যারা আছেন, তাদের কাছে গিয়ে তারা এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। প্রথমেই তো আপনারা অনৈতিক কাজ শুরু করছেন। অনৈতিক কাজ দিয়ে আপনারা মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। যাদের ভোটের শুরুটাই অনৈতিক কাজ দিয়ে, তারা কী করে সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এ বাংলাদেশে নারী-পুরুষ সবাই মিলে মাঠে কাজ করেন। কৃষক ভাইয়েরা যেমন মাঠে কাজ করেন, আমরা জানি কিষানি বোনেরাও মাঠে কাজ করেন। শুধু মাঠেই নয়, কলকারখানায় আমাদের মেয়েরা, বোনেরা, নারীরা–পুরুষের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। গার্মেন্টস শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন আমাদের নারীরা। কিন্তু আমরা কষ্টের সঙ্গে দেখছি, এই গুপ্ত দলের নেতা, এই জালেম দলের নেতা দুদিন আগে আমাদের নারীদের নিয়ে একটি কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছেন।’
কোনো দল বা নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান বলেন, ‘যেই ব্যক্তি বা যেই দলের তার দেশের মা-বোনদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই, যেই নেতা, যেই দলের নেতাকর্মীরা নিজের দেশের মা-বোনদের কষ্টের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান দেয় না, তাদের কাছ থেকে আর যা-ই হোক, বাংলাদেশ অগ্রগতি আশা করতে পারে না। দেশের মানুষ আত্মমর্যাদাপূর্ণ কোনো আচরণ আশা করতে পারে না।’
হযরত খাদিজা (রা.)-এর উদাহরণ দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের অর্ধেক নারী গোষ্ঠীকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়, সেই কথা তারা বলেছে। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজা একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন। তার নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। যেখানে নবী করিম (সা.) নিজেও কাজ করতেন; কিন্তু এরা বলে—ইসলামী রাজনীতি করে, প্রিয় নবীজির স্ত্রী যেখানে কর্মজীবী নারী ছিলেন, সেখানে কেমন করে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এমন একটি কলঙ্কিত শব্দে নারীদের জর্জরিত করল।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন বাংলাদেশের নারীদের এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্যে করে দিয়েছিলেন। তাই আজ আমাদের সময় এসেছে দেশ গড়ার। দেশ যদি গড়তে হয়, প্রতিটি নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে, দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। সেজন্যই আমরা এ নারীদের, বিশেষ করে গ্রামের-শহরের খেটে খাওয়া নারীদেরসহ সব গৃহিণীর কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব। নারীদের আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলব।’
বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের বিষয়েও কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ভোলায় সেতু করতে হবে, মেডিকেল কলেজ করতে হবে, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, মৎস্য খাতের উন্নয়নে কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র করতে হবে। ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়া এ বরিশালকে বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন; কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি। বিশেষ করে সব মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’
বরিশাল নগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান (সরোয়ার), জহির উদ্দিন (স্বপন), ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদিন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, নুরুল ইসলাম (মণি), বিজেপির সভাপতি আন্দালিব রহমান (পার্থ), গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর প্রমুখ।
ফরিদপুরে জনসভা: বরিশালে জনসভা শেষে ফরিদপুরে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে আরেক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তারেক রহমান। বেলা ৩টা ২১ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন তিনি।
প্রায় ২৫ মিনিটের বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের স্বাধীনতা, ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকারের বিরুদ্ধে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। এ ষড়যন্ত্র যারা করছে, তাদের জনগণ একটি নামে ডেকে থাকে। জনগণের পক্ষ থেকে তাদের একটি নাম দেয়া হয়েছে—গুপ্ত। জনগণ তাদের গুপ্ত নামে ডাকে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তারা রূপ পরিবর্তন করে।’
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান বলেন, ‘এদের কাছ থেকে আমরা ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না। ১৯৭১ সালে তাদের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের লাখ লাখ মা-বোনের সম্মানহানি হয়েছিল। এদের কাছ থেকে আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে। এরা বলবে একটা, করবে আরেকটা।’
ফরিদপুর বিভাগ গঠনের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এ নির্বাচনী জনসভায় আপনাদের সামনে আমি এতটুকু বলতে চাই, ফরিদপুর বিভাগ গঠন করলে যদি সমস্যা সমাধান হয়, তাহলে বিএনপি এটা সমাধান করবে। আমরা শুনেছি, প্রত্যেক এলাকা এত উন্নয়ন হয়েছে, তাহলে আপনাদের প্রার্থীরা এত সমস্যার কথা বলল কেন? সব ক্ষমতার উৎস জনগণ। দেশে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার থাকলেই কেবল দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপিকে ১২ তারিখ (ফেব্রুয়ারি) দেশের মানুষ ভোট দিলে কী কী করবে, তা আমরা পরিকল্পনা করেছি। এ এলাকার একটি অন্যতম সমস্যা নদীভাঙন। কৃষিপ্রধান এ এলাকায় আমরা নদীভাঙন রোধ করতে পারলে এ গ্রেটার ফরিদপুরের অন্যতম সেরা ফসল পাটকে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা পাব। কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই আমরা কৃষক কার্ড দেব। ফসল ফলাতে বীজ সার পৌঁছে দিতে চাই।’
তিনি পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, হাসপাতাল মেরামতের পাশাপাশি সারা দেশে হেলথ কেয়ার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান।
জনসভায় তারেক রহমান ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার ১৫টি আসনের বিএনপির প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী। সঞ্চালনা করেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একেএম কিবরিয়া।
