বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত জ্বালানি। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এ খাতের পণ্য আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজি ও কয়লা আমদানিতে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত জ্বালানি। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এ খাতের পণ্য আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজি ও কয়লা আমদানিতে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের গত দেড় দশকের শাসনামলে বিপুল ব্যয়ের এ আমদানি খাতকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কিছু ট্রেডিং কোম্পানি, রাজনৈতিক নেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীকে ঘিরে আবর্তিত হয় সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, কমিশন বা ফির নামে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে ঘুস বাণিজ্য হয়েছে বড় অংকের অর্থের। এ ঘুস বাণিজ্যের বড় অংশ পরিশোধ হয়েছে বিদেশে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী সরকার, দলটির রাজনৈতিক নেতারা পালিয়ে যান। জ্বালানি পণ্য আমদানিতে তাদের এসব দুর্নীতি-অনিয়ম অন্তর্বর্তী সরকার খতিয়ে দেখবে এমন প্রত্যাশা ছিল খাতসংশ্লিষ্টদের। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি খাতে ক্রয়, আমদানির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততা তৈরি করা হলেও জ্বালানি পণ্য আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি এ খাতে বিভিন্ন মহলের সিন্ডিকেট তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সরকারের সময়ে কী হয়েছে তার চেয়ে এখন দেখার বিষয় এ খাতে স্বচ্ছতার কোনো ঘাটতি হচ্ছে কিনা। সরকারি নিয়ম-নীতি অমান্য হচ্ছে কিনা। বরং বিশেষ আইন বাতিল করে এখন প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করা এবং সেই সঙ্গে ব্যয়সাশ্রয়ী নীতিও অনুসরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার জ্বালানি পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার। আর এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে আরো ৫৯ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কয়লা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ১৪ কোটি টাকা।
বিপুল পরিমাণ এ জ্বালানি পণ্য মূলত জিটুজি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হয়। জিটুজি প্রক্রিয়ায় পণ্য আমদানিতে অস্বচ্ছতার অভিযোগ না থাকলেও মূলত স্পট মার্কেট থেকে সরবরাহকারী অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে বিগত সরকারের সময়ে কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার মেকানিজম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এমনকি এসব কোম্পানির দুই-একটির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ভাই, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনের ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতাও ছিল। তবে জ্বালানি আমদানি বাণিজ্যকে ঘিরে অভিযোগ শুধু আন্তর্জাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ছিল বিষয়টি এমন নয়, বরং স্থানীয়ভাবে এসব কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও আমলাদের বড় যোগসাজশ ছিল।
আমদানি বাড়াতে এ লবির তৎপরতার কারণে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় আকারে বিনিয়োগ করা যায়নি। এ আমদানির কারণে রাষ্ট্রের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে। পেট্রোবাংলার সূত্রমতে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২ লাখ কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে তা যৎসামান্য।
দেশের জ্বালানি সংকট কাটাতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৭ সালে গ্যাসের মহাপরিকল্পনায় স্থানীয় গ্যাস খাতে বড় বিনিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে গ্যাস সংকট কাটাতে এলএনজি আমদানির পথ বেছে নেয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় দেশে গ্যাস খাতে ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইনে ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর গ্যাস অনুসন্ধান (স্থলভাগ ও সাগরে) ১০-১২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রাক্কলন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধান পরিকল্পনায় যে বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে তা যথাযথ ব্যয় করা গেলে গ্যাস উৎপাদনে বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে।
আওয়ামী সরকারের সময়ে দেশে এলএনজি আমদানিতে ঘুরেফিরে চারটি কোম্পানি কাজ পেয়েছে। এগুলো হলো সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া পিটিই সিঙ্গাপুর ও গানভর, সুইজারল্যান্ডের টোটাল এনার্জিস ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে ৬০ শতাংশের বেশি এলএনজি সরবরাহ করেছে ভিটল এশিয়া ও গানভর।
বর্তমানেও বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানির অন্যতম সরবরাহকারী কোম্পানি ভিটল এশিয়া। কোম্পানিটির মূল প্রতিষ্ঠান ভিটল ইনকরপোরেটেডের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুস প্রদান ও অনিয়মের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ব্রাজিল, একুয়েডর ও মেক্সিকোয় কর্মকর্তাদের ঘুস দিয়ে তেল বাণিজ্যে সুবিধা নেয়ার কথা তারা স্বীকার করেছে। এ অভিযোগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে মামলার সমাধান করতে কোম্পানিটি ১৩৫ মিলিয়ন ডলার ক্রিমিন্যাল পেনাল্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি ফিউচার ট্রেডিং কমিশনকে আরো ১৬ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ১৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করে। ব্রাজিলে পেট্রোব্রাস থেকে গোপন তথ্য ও সুবিধাজনক চুক্তি নেয়ার জন্য মিলিয়ন ডলার ঘুস দেয়ার অভিযোগও ওঠে। ঘুসের বাইরে জ্বালানি বাজারে দামের মানদণ্ড (বেঞ্চমার্ক) প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগও আছে এ কোম্পানির বিরুদ্ধে। এছাড়া ২০২১ সালে শ্রীলংকা সরকার পেট্রোলিয়াম জ্বালানি সরবরাহে অনিয়মের কারণে ভিটলকে কালো তালিকাভুক্ত করে।
